ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ জুলাই ২০২৪ ||  শ্রাবণ ৮ ১৪৩১

যুবদলের কমিটি দেখে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:২৭, ১০ জুলাই ২০২৪  

যুবদলের কমিটি দেখে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা

যুবদলের কমিটি দেখে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা

দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন ও রাজপথের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী যুবদলের সুপার সিক্স কমিটি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কমিটি বিলুপ্তির ২৫ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার ঘোষিত নতুন কমিটি নিয়ে হতাশ, ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হয়েছেন সংগঠনটির নেতাকর্মী। রাজপথে ভূমিকা পালনকারী, ত্যাগী, নির্যাতিত আর যোগ্যদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ও সিন্ডিকেটের নেতাদের দিয়েই কমিটি গঠন করেছেন দলটির হাইকমান্ড। এমনকি দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এ কমিটি গঠনে। এতে দলের বিভিন্ন স্তরে ভুল বার্তা যাবে বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা। যা একসময় দলের ভেতর সংকট তৈরি হতে পারে বলেও শঙ্কা ব্যক্ত করেন তারা।

নতুন কমিটিতে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটিতে সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল করিম পল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল এবং নুরুল ইসলাম সোহেলকে দপ্তর সম্পাদক করা হয়েছে। এর মধ্যে মোনায়েম মুন্না বিগত কমিটির সাধারণ সম্পাদক, নুরুল ইসলাম নয়ন ১ নম্বর সহসভাপতি, রেজাউল করিম পল সহসভাপতি, বিল্লাল হোসেন তারেক যুগ্ম সম্পাদক, কামরুজ্জামান জুয়েল সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং নুরুল ইসলাম সোহেল সহদপ্তর সম্পাদক ছিলেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এ কমিটি ঘোষণা দেওয়া হয়।

গত ১৩ জুন রাতে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণর, বরিশাল ও চট্টগ্রাম মহানগর শাখা এবং যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এর মধ্যে গত রোববার ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণসহ বরিশাল ও চট্টগ্রাম মহানগরের কমিটি ঘোষণা করে দলটি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দল পুনর্গঠনের পাশাপাশি নেতাদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ইতোমধ্যে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। সেখানে ত্যাগী, অভিজ্ঞ আর নির্যাতিত অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার পদাবনতি, আবার অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ও তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ঘিরে এ বিতর্কের সৃষ্টি। এর ধারাবাহিকতা থেকে যুবদলের মতো বৃহৎ ও শক্তিশালী সংগঠনেও এবার যোগ্য আর অভিজ্ঞদের দূরে সরিয়ে বিতর্কিতদের নিয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ নেতাকর্মীর। তারা বলছেন, নতুন কমিটিতে রাজপথে ঘাম ঝরানো আর কর্মীবান্ধব নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। বিএনপির হাইকমান্ড যদি এ রকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, তাহলে দল অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে আগামীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে। 

জানা গেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির রদবদল প্রক্রিয়ায় দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়নি। এটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে যুবদলের কমিটি নিয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে তিনি তাদের মতামত শোনেন। তবে কমিটি গঠনে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ নেতাদের। 

দলীয় নেতারা জানান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যুবদলের কমিটি গঠনে সংগঠনের এক নেতাকে নিয়ে ভিন্নমত দিয়েছিলেন। তারা বলেছেন, ‘তাকে দিয়ে যুবদলের মতো বড় সংগঠন চলতে পারে না।’ তবে কমিটিতে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসায় বেকায়দায় পড়েছেন ওই সব নেতা। এটাকে তারা উল্টো চপেটাঘাত বলেই মনে করছেন। কয়েকজন নেতা জানান, মূলত স্থায়ী কমিটির দু-একজন নেতাকে শায়েস্তা করতে কিংবা কোণঠাসা রাখতেই যুবদলের ওই নেতাকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে রেজাউল করিম পলের পদায়ন নিয়ে বিস্মিত সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। 

নেতারা জানান, বিএনপির রাজনীতিতে একজন ভাগ্যবান নেতার নাম রেজাউল করিম পল। এর আগে তিনি একই সঙ্গে ঢাকা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা যুবদলের সভাপতি আর কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতির মতো তিনটি পদে আসীন ছিলেন। অবশ্য যুবদলের গত কমিটিতে তিনি কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহসভাপতি পর্যন্ত পদে থাকাবস্থায় কোনো আন্দোলনেই তিনি মাঠে ছিলেন না। গত বছরের ২৮ অক্টোবরের পর শুরু হওয়া আন্দোলনেও একই ভূমিকা ছিল। ওই বছরের ১০ নভেম্বর গভীর রাতে ধানমন্ডির নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি। বিভিন্ন কলাকৌশলে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে জামিন পেলেও আর দেশে থাকেননি তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে সে রকম মামলাও নেই। এ রকম একজন নেতাকে কোন হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছে, তা কেউ জানেন না।  

সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসবেন, তা এক প্রকার নিশ্চিত ছিলেন সবাই। বিগত আন্দোলনে রাজপথে তাঁর ভূমিকা ছিল সবার চোখে পড়ার মতো। সেই হিসেবে তিনি মূল্যায়িত হয়েছেন বলে সংগঠনের নেতাকর্মী জানান।

সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের (জুয়েল-হাবিব কমিটি) সহসভাপতি এবং যুবদলের বিগত কেন্দ্রীয় কমিটির (টুকু-মুন্না) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকায় তাঁর নিজস্ব কোনো বলয় কিংবা অনুসারী নেই। তবে বিগত আন্দোলনে যুগ্ম সম্পাদক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মিছিলে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে তেমন মামলা নেই। এ রকম একজন নেতাকে এবারের যুবদল কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক করা হয়েছে। কামরুজ্জামান জুয়েল ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সভাপতি থেকে যুবদলের গত কমিটিতে সহসাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। আন্দোলনে তিনি মাঠে ছিলেন না। 

এদিকে দলের পোড় খাওয়া নেতা, বিগত আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী যুবদলের সাবেক নেতা মামুন হাসান, এসএম জাহাঙ্গীর, শফিকুল ইসলাম মিল্টন, গোলাম মাওলা শাহীন, ইসহাক সরকার কিংবা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকনদের পদায়ন হয়নি নতুন কমিটিতে। এর মধ্যে মামুন হাসানের বিরুদ্ধে বিগত দিনে তিন শতাধিক মামলা, সাত মামলায় ১৭ বছরের সাজা ছাড়াও পুরো পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়েছে। 

এসএম জাহাঙ্গীরকেও এক বছরের বেশি জেল খাটতে হয়েছে। বিগত দিনে আট মামলায় ১৬ বছরের সাজা হয়েছে তাঁর। ইসহাক সরকারের বিরুদ্ধেও তিন শতাধিক মামলার মধ্যে ১০ মামলায় ২১ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। গোলাম মাওলা শাহীনসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। এসব নেতাকে ঢাকা মহানগরকেন্দ্রিক বৃহৎ বলয়ের পাশাপাশি কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবেও অবস্থান রয়েছে। বিগত দিনের কমিটিতে ঢাকার স্থানীয় কিংবা মহানগরের নেতাদের মূল্যায়নের পাশাপাশি ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে সামনে নিয়ে আসা হতো। এবারের কমিটিতেই তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। যদিও এসব বিষয়ে সংগঠনের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মী কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রত্যেকেই চুপসে গেছেন নতুন কমিটির গঠন প্রক্রিয়া দেখে। 

তবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বড় দলে অনেক যোগ্য নেতা থাকে। সেখান থেকে যোগ্যদেরই মূল্যায়ন করেছে দল। 

আরও পড়ুন
রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়